ষাঁড় ও শেয়াল
এক অরণ্যে ছিল এক ষাঁড়। নাম তার তীক্ষ্ণবিষাণ। বিষাণ (শিং) দুটো ভীষণ ছুঁচালো তো। তাই এই নাম। যৌবনের অসীম শক্তি গায়ে। কুছ পরোয়া নেহি ভাব। তাই ছুটতে ছুটতে একদিন দলছুট হয়ে পড়ল। শিংজোড়া দিয়ে নদীর পাড় খুঁড়ে বেড়াত, আর কচি-কচি ঘাস খেত। তাই চেহারাখানা হয়েছে শিবঠাকুরের নন্দীর মতো।
সেই বনে থাকত এক শেয়াল। নাম তার প্রলোভক। যেমন হ্যাংলা, তেমন পেটুক। তাইতো নামটাও হয়েছে যুতসই।
একদিন প্রলোভক স্ত্রীকে নিয়ে নদীর ধারে বসে আছে। কত গল্প দুজনে। হাসি-ঠাট্টা I রসের কথা। বেশ কাটছিল সময়। এমন সময় তীক্ষ্ণবিষাণ এল জল খেতে। উবু হয়ে যখন জল খাচ্ছিল, তখন পেছন থেকে তার অণ্ডযুগল কেমন লম্বা হয়ে ঝুলছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি খসে পড়বে। তা দেখে শেয়ালনীর আর ধৈর্য ধরছিল না। সে স্বামীকে বলল: ওগো, দেখনা, কেমন সুন্দর পিণ্ডদুটি ঝুলছে! এক্ষুণি খসে পড়বে! নিয়ে এস না! মজা করে খাব!
স্ত্রীর কথা শুনে প্রলোভক একটু ভরকে গেল। যে তীক্ষ্ণ শিং! এক গুঁতো মারলে সোজা স্বর্গবাস! কিন্তু এ দুর্বলতার কথা স্ত্রীর কাছে বলা যায় কি করে? পৌরুষত্বের ব্যাপার তাই ঘুরিয়ে বলল: প্রিয়ে, ও-দুটো খসবে কি-না কে জানে। তাই অনিশ্চিতের পেছনে ছুটে কি হবে? তার চেয়ে নদীতে জল খেতে আসা দু-চারটে ইঁদুর ধরে দুজনে বসে খাই। সে-ই তো ভালো। শাস্ত্রে আছে না—
নিশ্চিতকে ছেড়ে যে অনিশ্চিতকে চায়।
নিশ্চিত অনিশ্চিত সে উভয়ই হারায়।।
তাছাড়া, তোমাকে ফেলে আমি যদি ওর পেছনে ছুটি, তাহলে খালি জায়গায় অন্য কেউ এসে বসে পড়বে। তখন দুই-ই যাবে।
শেয়ালনী মুখ বাঁকিয়ে তিরস্কারের সুরে বলল: তুমি আসলে একটা কাপুরুষ! ইঁদুর—বিড়াল যা পাও তাতেই খুশি হও। ঠিক যেমন পণ্ডিতেরা বলেছেন
ছোট নদী যথা ভরে অল্প জলে।
কাপুরুষ তথা খুশি স্বল্প পেলে।।
তাইতো মরদ যে, সে সর্বদা উৎসাহে টগবগ করে। সবাই তাকে ভয় পায়। ঠাণ্ডা জলে যে-কেউ হাত দিতে পারে। কিন্তু ফুটন্ত জলে? আসলে উদ্যম, আলস্যদমন, নীতি আর পরাক্রম—এসবের যেখানে সম্মেলন ঘটে, চঞ্চলা লক্ষ্মী সেখানেই স্থায়ী হয়। দেখ
অদৃষ্টের কথা ভেবে বসে থাকলে কি হয়?
তিল থেকে তেল কি চেষ্টা ছাড়া পাওয়া যায়??
তাছাড়া ইঁদুর খেতে-খেতে আমার অরুচি ধরে গেছে। ও-দুটো খেলে একটু রুচিরও পরিবর্তন হতো। তাই যাও না, নিয়ে এস পিণ্ডদুটো।
শেয়াল আর কি করে? স্ত্রীর আবদার। তাই বাধ্য হয়ে ষাঁড়ের পেছনে ছুটল। সঙ্গে শেয়ালনীও। কিন্তু পিণ্ডদুটি আর পড়ে না। একে একে এক যুগ চলে গেল। অবশেষে একদিন শেয়াল বলল: নিশ্চিত ইঁদুরও গেল, অনিশ্চিত পিণ্ডও পেলাম না। লাভের বেলা শূন্য!
শেয়ালনী সান্ত্বনার সুরে বলল: তা-ও ভালো। চেষ্টা করে না পেলেও কুড়েমির অপবাদ ঘোচে। চল আমরা আগের জায়গায় ফিরে যাই।
শেয়াল: তা-ই চল।
কিছুক্ষণ বিরাম নিয়ে সোমিলক বলল: ষণ্ডাণ্ড না পেলেও স্ত্রীর কাছে প্রলোভকের পুরুষত্ব রক্ষা পেয়েছে। তাই আমিও চাই, ভোগ না করতে পারলেও অর্থ আমার ঘরে থাকুক। তাতে মর্যাদা বাড়বে।
সোমিলকের কথায় যুক্তি আছে। অগ্রাহ্য করার মতো নয়। তাই পুরুষ বলল: ঠিক আছে। তুমি তাহলে আবার বর্ধমানে যাও। সেখানে দুই বণিক থাকে গুপ্তধন আর ভুক্তধন। প্রথমজন শুধু টাকা জমায়। আর দ্বিতীয়জন দিয়ে-থুয়ে ভোগ করে। তারা কে কেমন তা জান। জেনে তুমি যার মতো হতে চাইবে, তোমায় আমি তার মতো করে দেব। এই বলে সে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সোমিলক কিছুক্ষণ চিন্তা করে বর্ধমানে ফিরে গেল। সূর্য তখন ডোবে-ডোবে। ক্লান্তিতে পা যেন আর চলে না। জনে-জনে শুধিয়ে গুপ্তধনের বাড়ি গিয়ে উঠল। তখন রাত।
ঢোকামাত্র গুপ্তধন তো রেগে লাল! এ আবার কোন উৎপাত! অসময়ে এসেছে! নিশ্চয়ই থাকার ফন্দি! কি যে করি! এতসব ভেবে তাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সোমিলক জোর করেই বসে পড়ল। আর কি করা। একবেলা বাড়তি খরচ! এরূপ ভেবে গুপ্তধন নিতান্ত মনের বিরুদ্ধে সোমিলককে খাওয়ালো। সারাদিনের ক্লান্তির পরে মুহূর্তেই সে ঘুমিয়ে পড়ল। এক সময় সে ভীষণাকৃতির সেই পুরুষদ্বয়কে দেখতে পেল। একজন বলল: কর্তা, গুপ্তধনকে দিয়ে এই বাড়তি খরচ কেন করালেন?
অন্যজন: দেখ কর্ম, সোমিলকের কপালে ছিল এখানে একবেলা খাওয়া। আমি কি করব? পরিণাম অবশ্য তোমার হাতে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সোমিলক দেখল, গুপ্তধনের পেটে-অসুখ হয়েছে। তাই সে উপোস দিচ্ছে। এভাবে তার একবেলা বাড়তি খরচ পুষে গেল। এসব দেখে সোমিলক তক্ষুণি এ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেল। ঘুরতে-ঘুরতে এক সময় উপস্থিত হলো ভুক্তধনের বাড়ি। এখানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেখামাত্র ভুক্তধন সাদর সম্ভাষণে তাকে গ্রহণ করল। অতি আদরে খাওয়ালো-দাওয়ালো। নতুন পোশাক দিল। সজ্জিত বিছানা দিল। এবং অল্প সময়েই সোমিলক সুখনিদ্রায় আচ্ছন্ন হলো।
মধ্যরাতে স্বপ্নে দেখল ভীষণ সেই দুই পুরুষ। পরস্পর কথা বলছে। প্রথমজন বলছে: কর্তা, সোমিলকের সেবা করতে গিয়ে ভুক্তধনের তো অনেক খরচ হয়ে গেল। বেচারি সবই তো এনেছে প্রায় ধার করে। তা ওকে দিয়ে এত খরচ করালেন কেন?
দ্বিতীয়জন: ওহে কর্ম, ওর যে স্বভাব এ-ই। সেবাই ওর ধর্ম। তাই আমি বাধ্য হয়েছি করতে। এখন তোমার কাজ তুমি কর।
সকাল বেলা দেখা গেল এক রাজকর্মচারী এসে বলছে: ওহে ভুক্তধন, তুমি ভাগ্যবান! রাজা প্রসন্ন হয়ে এই টাকা তোমায় দিলেন। এই বলে একশটি সোনার মোহর তার হাতে দিল।
এসব দেখে সোমিলক ভাবল: এ-ই তো ভালো। না-ই বা থাকল জমানো টাকা। ঐ হাড়-কঞ্জুষ গুপ্তধনের চেয়ে এই ভুক্তধনই তো শ্রেষ্ঠ। রাজা স্বয়ং তাকে কত সম্মান করেন! পণ্ডিতরা তো ঠিকই বলেছেন—বেদের ফল ধর্মার্জন, বিদ্যার ফল চরিত্র, পত্নীর ফল প্রেম ও সন্তান আর টাকার ফল ভোগ ও দান। তাই আমার খাওয়া-পরার অতিরিক্ত গুপ্তধনের প্রয়োজন নেই। বিধাতা আমাকে দত্তভুক্তধন করুন। আমি যেন সবাইকে দিয়ে-থুয়ে খেতে পারি।
সেদিন থেকে সোমিলক দত্তভুক্তধন হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে মন্থরক হিরণ্যকের উদ্দেশে বলল: ভাই হিরণ্যক, তাই বলছিলুম—ঐ হারানো টাকার জন্য তুমি মন খারাপ করো না। আর দেখ, মাটির নিচে সঞ্চিত টকায় কেউ ধনী হয় না। সৎকাজে ব্যয় করাই হচ্ছে উপার্জিত অর্থের সার্থকতা। জলাশয়ে এক মুখে জল ঢুকবে, অন্য মুখে বেরিয়ে যাবে। তবেই জল ভাল থাকবে। বদ্ধজল এমনিতেই নষ্ট হয়ে যায়। টাকা ভোগ না করে যে কেবল সঞ্চয় করে, তার দান, টাকা মৌচাকের মধুর মতো অন্যেই খায়। টাকার পরিণতি হচ্ছে তিন রকম ভোগ আর নাশ। যে দানও করে না, ভোগও করে না, তার টাকা নষ্টই হয়। তাই বিবেকবান ব্যক্তি কেবল সঞ্চয়ের জন্যই টাকা আয় করে না। তাতে পরিণামে দুঃখ পেতে হয়।
তাছাড়া, বুনো হাতি লতা-পাতা খায়, অথচ তার গায়ে কি বল! মুনি-ঋষিরা ফল-মূল খেয়ে জীবান কাটান। অথচ তাঁদের কি তেজস্বিতা! আসলে সন্তোষই শান্তির মূল কারণ। ধনের পেছনে যারা ছোটে, তাদের শান্তি কোথায়? সূর্যকে মেঘে ঢাকলে তার রোদ্দুরও যেমন ঢাকা পড়ে, তেমনি কামনা-বাসনা মানুষের চিত্তকে রুদ্ধ করলে তার ইন্দ্রিয়সমূহও রুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে তার সুখানুভূতি থাকে না। তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি আগুন পোহালে কি তার তৃষ্ণা মেটে? তাতে তৃষ্ণা আরো বেড়ে যায়। শোননি—
লোভের তুল্য শত্রু নেই, দানের তুল্য ধন।
চরিত্রতুল্য অলঙ্কার নেই—বলেন গুণিজন।।
আর অধিক কি বলব? দেখ—জগতে আসল দরিদ্র সে, যার আত্মসম্মান বোধ নেই। তার প্রমাণ শিব ঠাকুর। সম্বল মাত্র একটি বৃদ্ধ ষাঁড়। রাজ্য নেই। সিংহাসন নেই। আর কিছুই নেই। অথচ তিনিই দেবাদিদেব। সুতরাং, লোভ করো না। সন্তোষ করো। মন্থরক হিরণ্যককে এত উপদেশ দিল। অনেক রূঢ় কথাও বলল। এতে সে মনে কষ্ট পেতে পারে। এই ভেবে লঘুপতনক সান্ত্বনার সুরে বলল: ভাই হিরণ্যক, মন্থরকের কথায় কিছু মনে করো না। তার কথাগুলো সর্বদা মনে রেখ। প্রকৃত বন্ধু বন্ধুর মঙ্গলের জন্য এমন উপদেশই দেয়। দেখ, মুখে মিষ্টি কথা বলে এমন লোক পাওয়া শক্ত নয়। কিন্তু শুনতে খারাপ লাগে, অথচ পরিণামে মঙ্গলজনক— এমন কথা-বলা লোক দুর্লভ। আবার এমন কথা শোনার লোকও দুর্লভ। কিন্তু প্রকৃত বন্ধু প্রিয় অহিতকর কথার চেয়ে অপ্রিয় হিতকর কথাই বলে থাকে। মন্থরককেও তুমি তা-ই মনে করবা।
এরা তিনজন যখন এরূপ আলাপ করছিল, তখন চিত্রাঙ্গ নামে এক হরিণ ব্যাধের ভয়ে সেই জলাশয়ে এসে লুকাল। তাকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে লঘুপতনক গাছে উঠে গেল। হিরণ্যক শরবনে গিয়ে লুকাল। আর মন্থরক গেল জলাশয়ে। তারপর লঘুপতনক ভালো করে নিরীক্ষণ করে মন্থরককে বলল: বন্ধু, হরিণটা তেষ্টা পেয়ে জল খেতে এসেছে। ভয় নেই। চলে এস।
মন্থরক: কিন্তু ওকে যেরকম দেখছি রীতিমতো হাঁপাচ্ছে, ভয়ার্ত দৃষ্টিতে বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে—তাতে মনে হচ্ছে, ও ভয় পেয়েছে। নিশ্চয়ই ব্যাধ ওকে তাড়া করেছে। দেখো তো ওর পেছন-পেছন ব্যাধগুলো ছুটে আসছে কি-না। কারণ—
ভয়াতজন ঘন-ঘন জোরে নেয় শ্বাস।
স্বস্তি পায় না কিছুতে, করে হাস-পাস॥
মন্থরকের কথা শুনে চিত্রাঙ্গ বলল: মহায়শয় ঠিকই ধরেছেন। ব্যাধ আমাকে তাড়া করেছে। ওদের তীর এড়িয়ে কোনরকমে আমি পালিয়ে এসেছি। দলের অন্যরা হয়তো এতক্ষণে ওদের কাঁধে ঝুলছে। আমি শরণাগত। আমায় বাঁচান।
মন্থরক: ওহে চিত্রাঙ্গ, তুমি কি নীতিশাস্ত্র শোনো নি—
শত্রু এলে মুক্তি পাবার দুটি উপায় মোটে।
হাত কেমন চলে, আর পা কেমন ছোটে।।
তাই শিগগির পালাও। ঐ কাছেই গভীর বন আছে। সেখানে ঢুকে পড়।
এমন সময় লঘুপতনক এসে বলল: ওহে চিত্রাঙ্গ, ব্যাধগুলো তাল-তাল মাংস নিয়ে ফিরে গেছে। আর বিপদ নেই। তুমি জল থেকে উঠে এস।
অশ্বাস পেয়ে চিত্রাঙ্গ জল থেকে উঠে এল। মন্থরকও এল। লঘুপতনক নিচে নেমে ‘কা কা’ রবে ডাকলে হিরণ্যকও চলে এল। তারপর সেই গাছের নিচে তারা একত্র হলো। নতুন বন্ধু চিত্রাঙ্গকে পেয়ে সবাই খুশি। মাহসুখে তাদের দিন কাটতে লাগল।
একদিন আড্ডার সময় হঠাৎ চিত্রাঙ্গ অনুপস্থিত। কি ব্যাপার! সবারই মুখ কালো হয়ে গেল। মন্থরক উদ্বেগের সঙ্গে বলল: ভাই লঘুপতনক, আমরা দুজনেই ধীরে চলি। তোমার গতি দ্রুত। একটু খোঁজ করে দেখ না, বন্ধুর কোন বিপদ হলো না-কি! প্রিয়জন দূরে থাকলে যেকোন অসঙ্গতি মনে শঙ্কা জাগায়।
লঘুপতনক তক্ষুণি উড়াল দিল। উড়তে-উড়তে দেখে, এক বনের ধারে ব্যাধের জালে আটকা পড়ে আছে চিত্রাঙ্গ। কাছে যেতেই হাউ-মাউ করে উঠল। বন্ধুকে দেখে তার শোক উথলে উঠল। বিপদে প্রিয়জনকে দেখলে এমনই হয়। চিত্রাঙ্গ কাঁদতে-কাঁদতে বলল: বন্ধু, মরণকালে তোমায় কাছে পেয়ে মনের সাধ মিটল। আমি চললুম। কোনো অপরাধ করে থাকলে মাফ করে দিও। মন্থরক আর হিরণ্যককে বলো আমার কথা আমায় যেন ক্ষমা করে।
লঘুপতনক তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল: তুমি এত ভেঙ্গে পড়ছ কেন? আমরা আছি না। তাছাড়া শাস্ত্রে আছে—
সুদিনে দুর্দিনে যে নির্বিকার রয়।
তার জন্মদাত্রীরা কদাচিৎ হয়।।
তুমি ধৈর্য ধর। আমি এক্ষুণি গিয়ে হিরণ্যককে নিয়ে আসছি। সে মুহূর্তে তোমাকে মুক্ত করবে।
এই বলে লঘুপতনক উড়ে গিয়ে হিরণ্যককে পিঠে করে নিয়ে এল। তাকে দেখে চিত্রাঙ্গ আশ্বস্ত হয়ে বলল—
কে পারে রে তরতে বিপদ, এই দুনিয়ায় বন্ধু ছাড়া।
তাই তো উচিত বুদ্ধিমানের, ভালো দেখে বন্ধু করা।
হিরণ্যক হাসতে হাসতে বলল: হয়েছে। এবার চুপ করে বসো তো একটু। আমি বাঁধনটা খুলে দেই।
এমন সময় মন্থরকও এসে হাজির। তাকে দেখে তিনজনই ভয়ে আঁতকে উঠল । লঘুপতনক বলল: বন্ধু, এ তুমি কি করলে? ব্যাধটা যদি এসে পড়ে তাহলে কি হবে? আমরা না হয় পালাতে পারব। কিন্তু তুমি?
মন্থরক কিছুটা ইতস্তত করে বলল: কি করব, ভাই! ঐখানে বসে বসে বন্ধুর বিপদের অগ্নিজ্বালা আর সইতে পারছিলাম না। তোমরা তিনজনেই চলে এলে। তোমাদের কিছু হলে আমার একার জীবন দিয়ে আর কি হবে? তাই চলে এলুম। দেখ—প্রিয়বিরহ কিংবা অর্থনাশ—এ-ও সওয়া যায়, যদি ভালো বন্ধু থাকে। প্রাণ গেলে হয়তো জন্মান্তরে প্রাণ ফিরে পাব। কিন্তু তোমাদের মতো বন্ধু পাব—তার নিশ্চয়তা কোথায়? লঘুপতনক: আচ্ছা, ঠিক আছে। ঐ যমদূতটা আসার আগেই তুমি ফিরে যাও। আমরাও আসছি।
এমন সময় দূর থেকে দেখা গেল কালবৈশাখীর মেঘের মতো ব্যাধটা ছুটতে ছুটতে আসছে। তা দেখেই হিরণ্যক তাড়াতাড়ি চিত্রাঙ্গের বাঁধন কেটে দিল। সে দ্রুত বনের মধ্যে ঢুকে গেল। লঘুপতনক উড়ে গেল গাছে। হিরণ্যক নিকটেই এক গর্তে ঢুকে পড়ল। আর মন্থরক গুটিগুটি পায়ে চলতে লাগল।
এদিকে ব্যাধ এসে দেখল, হরিণটা পালিয়ে গেছে। ক্ষোভে-কষ্টে তার বুক যেন ফেটে যায়। কি আর করা? হঠাৎ দেখল মন্থরককে। তাকেই জালে আটকে চলল বাড়ির দিকে।
মন্থরককে নিয়ে যেতে দেখে হিরণ্যকের বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে। সে বিধাতার উদ্দেশে বলল: আমার অর্থ নিয়েছ, তা সয়েছি। চাকর-বাকর ছেড়ে গেছে। তা-ও সয়েছি। দীর্ঘদিনের দুর্গ। তা-ও এক বাক্যে ছেড়ে এসেছি। এত কিছু হারিয়ে এমন একজন বন্ধুকে আকড়ে ধরলাম, যে কোনো দিন কারো ক্ষতি করে নি। তাকেও আজ হারাতে হবে? তবে এ জীবন দিয়ে আর কি হবে? হে বিধাতা, তুমি কেন আমার প্রতি এত নিষ্ঠুর হলে? আসলে ঘায়ের ওপরই ঘা পড়ে। একবার বিপদগ্রস্ত হলে, হাজার বিপদ তাকে ঘিরে ধরে।
হিরণ্যক যখন এভাবে বিলাপ করছে, তখন চিত্রাঙ্গ আর লঘুপতনকও কাঁদতে-কাঁদতে সেখানে এল। তিনজনের শোক একত্র হয়ে সমুদ্রে ঢেউ তুলল। তারপর এক সময় হিরণ্যক বলল: কেঁদে কোনো লাভ নেই। বন্ধুকে নিয়ে আড়ালে যাওয়ার আগেই উদ্ধারের উপায় ভাবতে হবে। কথায় বলে—হাতের ধন রক্ষা করা, অপ্রাপ্তকে পাওয়ার চেষ্টা করা আর বিপন্নকে মুক্ত করা এ তিনটি হচ্ছে সেরা মন্ত্রণা। তাই উপায় ভাব। হিরণ্যকের কথায় সায় দিয়ে লঘুপতনক বলল: উপায় একটা আছে। শোনো। ব্যাধের যাওয়ার পথে একটা ডোবা পড়বে। চিত্রাঙ্গ তার পাড়ে গিয়ে মরার মতো পড়ে থাকবে। আমি ঠোঁট দিয়ে তোমার কান খুটতে থাকব। ব্যাধ ভাববে—হরিণটা জাল থেকে ছুটে এসে এখানে মরে আছে। সে নিশ্চয়ই মন্থরককে ফেলে চিত্রাঙ্গকে ধরতে যাবে। সেই মুহূর্তে হিরণ্যক গিয়ে মন্থরকের বাঁধন কেটে দেবে। সে দ্রুত ডোবায় ডুববে। আর আমি ডাক দিতেই চিত্রাঙ্গ দেবে দৌড়। সব ঠিক মতো হলে সবাই বাঁচব।
প্লানমতো সবই হলো। ব্যাধ কচ্ছপ ফেলে হরিণ ধরতে গিয়ে উভয়ই হারাল। তারপর বিধাতা আর ভাগ্যকে দোষারোপ করতে করতে খালি হাতে বাড়ি ফিরল।
এদিকে ব্যাধ চলে গেলে লঘুপতনক, মন্থরক, হিরণ্যক ও চিত্রাঙ্গ একত্র মিলিত হলো। তারা আবার সেই জলাশয়ের পাড়ে গিয়ে মহাসুখে দিন কাটাতে লাগল। তাই শাস্ত্ৰ বলছে—
বন্ধুর মতো বন্ধু পেলে, আর কি লাগে জীবনে।
সহায় থাকে এমন বন্ধু, জীবনে ও মরণে।।

