সোমিলক ও গুপ্তধন
এক নগরে থাকত এক তাঁতি। নাম তার সোমিলক। হরেক রকম মিহি কাপড় বোনায় তার জুড়ি ছিল না। তাই রাজা-মহারাজা সকলেই আসতেন তার কাছে। কাপড় বানাতে। এত গুণী শিল্পী হলে কি হবে? খাওয়া-পরার বেশি টাকা তার ছিলনা কোনো কালেই। কিন্তু যারা মোটা কাপড় বুনত, তারা সবাই ছিল ধনী।
একদিন সে স্ত্রীকে বলল: আমি বিদেশ যাব।
স্ত্রী বিস্ময়ের সঙ্গে বলল: হঠাৎ বিদেশ কেন?
তাঁতি: মোটা কাপড় বুনে ওরা সব বড়লোক! সোনা-দানায় ভরা ওদের ঘর! আর এত মিহি কাপড় বুনেও আমার ঘরে কিছু নেই! তাই এ অন্যায়ের দেশে আর কাজই করব না! বিদেশ গিয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা আনব।
স্ত্রী: দেখ, বিদেশ গেলেই টাকা হয়, আর দেশে থাকলে হয় না—এটা ঠিক নয়। আসলে সবই অদৃষ্ট। তাইতো শাস্ত্র বলছে যা হবার, তা এমনিতেই হয়। যা হবার নয়, তা কোথাও হয় না। অদৃষ্টে না থাকলে তা হাতের মুঠোয় এসেও ফসকায়। তাছাড়া, কর্ম অনুযায়ী ফল লাভ হয়। দেখ না যে পাখিটি নীল আকাশে ওড়ে, সে মাটিতেও নামে। হাজার গাভীর মধ্যে বাছুরটি যেমন তার মাকে খুঁজে নেয়, পূর্বজন্মের কর্মও তেমনি এ জন্মে তার কর্তাকে খুঁজে নেয়। আলো আর ছায়া যেমন একে-অন্যের জোড়া, কর্ম ও তার ফলও তেমনি পরস্পর আবদ্ধ। কাজেই দূরে গিয়ে কাজ নেই। তুমি এখানেই লেগে থাক।
স্ত্রীর কথার তীব্র প্রতিবাদ করে তাঁতি বলল: তোমার কথা মোটেই ঠিক নয়। উদ্যম ছাড়া জগতে কিছুই হয় না। হাত থাকলেই যেমন তালি বাজে না, তেমনি উদ্যম ছাড়া কার্যসিদ্ধিও হয় না। দেখ—কর্মফলে খাবার জুটলেও হাতের চেষ্টা ছাড়া তা কি মুখে যায়? আর চঞ্চলা লক্ষ্মী উদ্যোগী পুরুষকেই আশ্রয় করে, অদৃষ্টবাদী কাপুরুষকে নয়। ইচ্ছা ছাড়া কোনো কার্যসিদ্ধি হয় না। সিংহ বনের রাজা। সবাই তাকে ভয় পায়। কিন্তু ক্ষুধার্ত সিংহ যদি চোখ বুজে হাঁ করে থাকে, তাহলে কোনো প্রাণী কি আপনা থেকেই তার মুখে ঢোকে? তাই অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে বসে থাকার চেয়ে চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়াও ভালো। অতএব, আমি বিদেশ যাবই।
এই বলে সোমিলক একদিন বর্ধমান শহরে গেল। সেখানে তিন বছর কাটাল। তারপর একদিন তিনশ সোনার মোহর নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল।
চলতে চলতে রাত নেমে এল। জন্তু-জানোয়ারের ভয়। তাই বড় একটা বটগাছের গুঁড়ির উপর উঠে সে ঘুমিয়ে পড়ল। গভীর রাতে স্বপ্ন দেখল ভয়ঙ্কর দুই পুরুষ কথা বলছে।
প্রথম: কর্তামশাই, সোমিলকের কপালে তো খাওয়া-পরার বেশি টাকা লেখা নেই। তবু আপনি তাকে তিনশ মোহর দিলেন কেন?
দ্বিতীয়: শোনো কর্ম, যে চেষ্টা করে, তাকে আমি দিতে বাধ্য। এর পরের ব্যাপার তোমার।
একথা শুনে সোমিলকের ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে থলিতে হাত দিয়ে দেখে—খালি! তখন সে ক্ষোভের সঙ্গে বলল হায় রে! এত কষ্ট করে টাকা রোজগার করলাম! মুহূর্তে তা কোথায় গেল? আমার সব পরিশ্রম জলে গেল! এতদিন পরে খালি হাতে আমি বৌয়ের কাছে গিয়ে মুখ দেখাব কি করে?
এরূপ চিন্তা করে সে আবার সেই শহরে ফিরে গেল। সেখানে এক বছরে পাঁচশ মোহর উপার্জন করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। মাঝপথে আবার রাত হয়ে গেল। কিন্তু পাছে মোহর হারিয়ে যায়—এই ভয়ে সে আর কোথাও থামল না। জোর কদমে এগিয়ে চলল বাড়ির দিকে। কোনোমতে পৌঁছতে পারলেই হয়।
কিন্তু আবার সেই ভয়ঙ্কর দুই পুরুষ। একজন বলল: ওহে কর্তা, যার কপালে খাওয়া—পরার বেশি নেই, তাকে আপনি পাঁচশ মোহর দিলেন?
অন্যজন: ওহে কর্ম, ও যে কাজ করেছে। তাই আমাকে যে দিতেই কবে। আমার কাজ আমি করেছি। এখন তোমার কাজ তুমি কর।
শুনে তৎক্ষণাৎ সোমিলক থলিতে হাত দিয়ে দেখে মোহর নেই। দুঃখে-কষ্টে সে নির্বাক হয়ে গেল। তার চলচ্ছক্তি নেই। ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে ভাবল: আমার টাকা নেই, পয়সা নেই। এই দরিদ্র জীবন দিয়ে কি হবে? এর চেয়ে আত্মহত্যাই ভালো।
এই ভেবে সে ঘাস দিয়ে দড়ি বানাল। উঁচু গাছে উঠে গলায় ফাঁস লাগিয়ে যেই ঝুলে পড়বে, ঠিক তখন এক সুপুরুষ তার সামনে শূন্যে দাঁড়িয়ে বলল: থাম সোমিলক, তোমার মোহর আমিই নিয়েছি।
সোমিলক বিস্ময় এবং কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বলল: কেন?
পুরুষ: কারণ, তোমার ভাত-কাপড় তো ঠিকই চলছিল। তোমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছিল দিকে দিকে। কেন তুমি অর্থের পেছনে ছুটছ? এটা আমার পছন্দ নয়। তুমি বাড়ি ফিরে যাও। তবে, তোমার সাহস ও উদ্যোগ দেখে আমি সন্তুষ্ট। তুমি আমার কাছে যে—কোনো বর প্রার্থনা কর।
সোমিলক এবার সাহসে ভর করে বলল: প্রভু, যদি তাই হয়, তাহলে আমাকে অনেক টাকা দিন।
পুরুষ: অনেক টাকা দিয়ে তুমি কি করবে? খাওয়া-পরার বেশি তো তোমার কপালে নেই। নপুংসকের স্ত্রীর মতো এ ধন নিয়ে তুমি কি করবে?
সোমিলক: ভোগ না করতে পারি, তবু আমার টাকা হোক। কারণ, যার টাকা আছে তাকে সবাই কঞ্জুস বললেও, সজ্জনেরা তার ত্রিসীমায় না এলেও, তার বংশ অতি সাধারণ হলেও লোকে তাকে সমীহ করে। তাছাড়া—
স্ত্রীর বাক্যবাণ বড়ই নির্দয়।
হানে যবে পুরুষের কঠিন হৃদয়।।
অণ্ডলোভে ছোটে তাই চতুর শেয়াল—
ষণ্ডের পেছনে, কিন্তু পোড়া যে কপাল।।
পুরুষ: সে কি রকম?
সোমিলক: শুনুন তাহলে …

