বণিকপুত্র ও রাজকন্যা
এক নগরে থাকত এক বণিক। নাম সাগরদত্ত। তার একমাত্র পুত্র ছিল বিদ্যোৎসাহী ও চরিত্রবান। সারাক্ষণ বই নিয়েই পড়ে থাকত। কিন্তু, বণিকের এটা পছন্দ নয়। বণিকপুত্র বণিক হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, পুত্র তার ধার দিয়েও যায় না। তাই বণিকের মনে অনেক দুঃখ!
একদিন পুত্র একখানা বই কিনে আনল। বণিক দাম জানতে চাইলে বলল—একশ টাকা।
বণিকের তো মাথায় হাত! একশ টাকা! একখানা বইয়ের দাম! তা তুই কিনলি? হায়! হায় রে! তুই আমার সর্বনাশ করে ছাড়বি রে! আমি এখন কি করি? তোকে কি করে বোঝাই যে, বস্তা-বস্তা বই গিললেও পেটের কোণাটুকুও ভরে না!
বণিকের চিৎকারে বাড়িটা যেন ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। বণিক চিৎকার করে বলেই চলেছে—এই বুদ্ধি নিয়ে তুই কি করে টাকা রোজগার করবি? এর চেয়ে আমার অপুত্রক থাকাও ঢের ভাল ছিল! যা, এক্ষুণি আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যা। আর কোনদিন এ বাড়িতে ঢুকবি না! বণিকপুত্র কিছু না বলে রাগে-দুঃখে তৎক্ষণাৎ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। সঙ্গে নিল সেই বইখানা।
ঐ বইতে একটি সংস্কৃত শ্লোক ছিল। তার প্রথম লাইনটি ‘প্রাপ্তব্যমর্থং লভেত মনুষ্যঃ’—অর্থাৎ, মানুষ তার প্রাপ্য বস্তু পাবেই। বণিকপুত্র শুধু এই লাইনটিই বলত আর নগরময় ঘুরে বেড়াত। লোকে তাই তাকে ‘প্রাপ্তব্যমর্থং’ বলে ডাকত। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে সে এক ভিন রাজ্যে চলে গেল। সেখানেও সে এই নামেই পরিচিত হলো।
এদিকে বসন্তের এক দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মদনমহোৎসব। হাজার লোকের সমাগম রাজকন্যা চন্দ্রাবতীও এসেছে উৎসব দেখতে। পূর্ণযৌবনা। সৌন্দর্যের তুলনা হয়, পৃথিবীতে এমন কিছু নেই। হাতির পিঠে চড়ে সখীর সঙ্গে উৎসব দেখছে। হঠাৎ রাজপুত্রের ন্যায় এক যুবক দেখে চন্দ্রাবতী কামশরে বিদ্ধ হলো। সখীকে বলল—হয় আজ রাতেই ওর সঙ্গে আমার মিলন ঘটাও, নইলে চিতা সাজাও। সখী আর কি করবে? নেমে গিয়ে যুবকের পরিচয় নিল। নগরেই বাস। সামান্য ভূমিকার পর রাজকন্যার অভিলাষের কথা তাকে জানাল। এবং বলল চন্দ্রাবতীর প্রাসাদ থেকে একটা দড়ি ঝোলানো থাকবে। সেটা বেয়ে সোজা তার ঘরে চলে যেও।
যুবক প্রথমে একটু ইতস্তত করছিল। কিন্তু সখীর অনুরোধে রাজি হলো। সখী ফিরে গিয়ে রাজকন্যাকে আশ্বস্ত করল। এবং মনের আনন্দে মদনোৎসব দেখে দুজন প্রাসাদে ফিরে গেল।
চন্দ্রাবতীর মনে হচ্ছে, যুগ যেন কয়েকটা চলে গেল, অথচ রাত আর আসছে না। আসলে অপেক্ষার সময় এবং কালরাত শেষ হতে চায় না। যা হোক, অনেক অপেক্ষার পর সেই কাঙ্ক্ষিত সময় ঘনিয়ে এল। রাজকন্যা সেজে-গুজে জানালার ধারে বসে আছে কখন দড়িতে টান পড়ে। কিন্তু, না! কেউ এল না! প্রহরের পর প্রহর যায়। দড়িতে টান আর পড়ে না। কারণ, যুবক ভাবছে—কাজটা ঠিক হবে না। সে শিক্ষিত। শাস্ত্ৰ জানে। গুরুকন্যা, মিত্রভার্যা, প্রভুকন্যা কিংবা ভৃত্যপত্নীতে যে উপগত হয়, লোকে তাকে ব্রহ্মঘাতী বলে। এই ভেবে যুবক নিরস্ত হয়।
এদিকে বণিকপুত্র ঘুরতে ঘুরতে ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল। প্রাসাদ থেকে দড়ি ঝোলানো দেখে তার কৌতূহল হয়। সে দড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর রাজকন্যার তন্দ্রার মতো এসেছিল। কিন্তু বণিকপুত্রের ঘরে ঢোকার শব্দে তার তন্দ্রা কেটে যায়। সে ভাবে, তার প্রাণবল্লভই এসেছে। তাই অন্ধকারে এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে অনুযোগের সুরে বলে: আমি তোমার জন্য প্রাণে মরে যাচ্ছি! আর তুমি এত দেরি করে এসেও চুপ করে আছ? কথা বল, প্ৰাণনাথ!
বণিকপুত্র ঘটনার আকস্মিকতায় কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। তাই সে বলে উঠল: প্রাপ্তব্যমর্থং লভেত মনুষ্যঃ। রাজকন্যা বুঝল—এ-তো সে নয়। তাই দ্রুত সরে এল। এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় উভয়েই লজ্জিত হলো। পরে রাজকন্যার কথামতো বণিকপুত্র সেই দড়ি বেয়ে নেমে অদূরবর্তী একটা মন্দিরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
কিন্তু এখানেও বিড়ম্বনা। নগরের চৌকিদার গোপন অভিসারে এসে দেখে, কে যেন শুয়ে আছে। তাই অভিসারের কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে একে সরানোর উদ্দেশ্যে সে বলল: কে তুমি? এত রাতে কি চাও এখানে?
বণিকপুত্র বলল: প্রাপ্তব্যমৰ্থং লভেত মনুষ্যঃ।
চৌকিদার ভাবল, প্রেয়সী এখনই চলে আসবে। তাই এর সঙ্গে বেশি কথা বলার সময় নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একে সরিয়ে দিলেই মঙ্গল। তাই সে নরম গলায় বলল: ভাই, এ মন্দির জনশূন্য। নিরাপদ নয়। পাশেই আমার বাড়ি। তুমি সেখানে গিয়ে নির্ভয়ে ঘুমাও।
বণিকপুত্র আর কি করবে। বিদেশ-বিভূঁই। যে যা বলে তা-ই শুনতে হয়। তাই উঠে চলে গেল চৌকিদারের বাড়িতে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোনরকমে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এক নারীকণ্ঠ বলে উঠল: এসেছ, নাথ! কেউ দেখেনি তো?
বণিকপুত্র তৎক্ষণাৎ কিছু বলতে পারল না। ঘটনার আকস্মিকতায় সে হতবিহ্বল। কণ্ঠটি আসলে চৌকিদারের ষোড়শী কন্যা বিনয়াবতীর। প্রেমিকের অপেক্ষায় ছিল। সে-ছাড়া এই রাতে এই অন্ধকারে আর কে আসবে? বাবা তো কর্তব্যরত। তাই হাত ধরে টানতে টানতে আবার প্রশ্ন: কথা বলছ না কেন?
বণিকপুত্রের কথা একটাই: প্রাপ্তব্যমর্থং লভেত মনুষ্যঃ।
অপরিচিত কণ্ঠে এই দুর্বোধ্য বাক্য শুনে বিনয়াবতী কিংকর্তব্যবিমূঢ়। লজ্জা, ভয় সব কিছু একত্র হয়ে তাকে কাবু করে ফেলল। ঝটকা মেরে দূরে সরে গিয়ে সে বলল: কে আপনি?
বণিকপুত্র: সে পরিচয়ে কাজ নেই। আমি যেমন এসেছি তেমনই চলে যাচ্ছি। অন্ধকার আমাদের উভয়ের বন্ধু। ভালোবাসায় কোনো পাপ নেই। তবে সাবধানতাও দরকার। এই বলে বণিকপুত্র রাস্তায় নেমে ধীরপায়ে হাটতে লাগল। জোরে হেটে কোথায় যাবে? জানা নেই। হঠাৎ দেখে, বাদ্য-বাজনাসহ বর যাচ্ছে বিয়ে করতে। বণিকপুত্র ভিড়ে গেল তাদের দলে। গান-বাজনা। আতশবাজি। হৈ-চৈ। মজাই আলাদা। সব কষ্ট ভুলে সে-ও মহানন্দে হেটে চলল। দেখতে দেখতে কনের বাড়ির দরজায় পৌঁছে গেল তারা। এ যে-সে কন্যা নয়। শ্রেষ্ঠিকন্যা। রাজ্যের সব অলঙ্কার পরে যেন ডানাকাটা পরিটি বসে আছে স্বর্ণাসনে। চতুষ্পার্শ্বে সখীরা। তার রূপে লজ্জা পেয়েই চন্দ্রমা যেন লুকিয়েছে। তাই ধরায় এত অন্ধকার।
হঠাৎ চিৎকার চেচামেচি! দিক-বিদিক ছোটাছুটি! মরলাম গো! বাঁচাও গো! কে কোথায় আছ! এসবের কারণ বরের হাতিটি। মাতাল হয়ে মাহুতকে মেরে সব দলে-মলে ছুটছে। বরসহ যে যেদিকে পারে পালিয়ে বেঁচেছে। কনেটি কচি কলাপাতার মতো ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। কেউ তার কাছে নেই। বণিকপুত্র দৌড়ে গিয়ে অভয় দিল: আমি আছি। এই বলে সে হাতিটাকে কৌশলে অন্যদিকে নিয়ে গেল। তারপর সব শান্ত। সূর্যদেব চোখ মেলেছেন। একে একে সবাই ফিরে এল। ভোরের আলোযে সবাই দেখল শ্রেষ্ঠিকন্যা পরম নিশ্চিন্তে বণিকপুত্রের পাশে বসা। বর শ্রেষ্ঠীকে অনুযোগ করে বলল: শ্বশুরমশাই, এ কি করে হলো? আমি যে বেদখল হয়ে গেলাম!
শ্রেষ্ঠী: হাতির ভয়ে তুমিও পালিয়েছিলে, আমিও পালিয়েছিলাম। তুমিও ফিরেছ, আমিও ফিরেছি। তাই আমি কি করে জানব?
শ্রেষ্ঠিকন্যা এবার ক্রুদ্ধস্বরে বলল: ইনি আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। তাই ইনি ছাড়া আর কেউ আমার পাণিগ্রহণ করতে পারবে না।
এ নিয়ে বচসা শুরু হলো। জলের ঢেউয়ের মতো একথা কানে-কানে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই ছুটে এল স্বচক্ষে দেখার জন্য। চৌকিদার এল। চৌকিদারের মেয়ে এল। রাজকন্যা এল। এমনকি রাজাও এলেন। তিনি বণিকপুত্রকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমিই খুলে বল, কি হয়েছে?
বণিকপুত্র নির্বিকারভাবে বলল: প্রাপ্তব্যমর্থং লভেত মনুষ্যঃ। একথা শুনে চৌকিদার, চৌকিদারের মেয়ে এবং রাজকন্যা তিনজনই আঁতকে উঠল। মনে মনে বলল: এ-ই তাহলে সেই! কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলল না।
রাজা তাকে অভয় দিয়ে বললেন: তুমি নির্ভয়ে সত্যি কথা বল।
বণিকপুত্র তখন বই কেনা থেকে শুরু করে শ্রেষ্ঠিকন্যা উদ্ধার পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। রাজা একে একে রাজকন্যা, চৌকিদার এবং তার মেয়েকে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সবাই স্বীকার করল। রাজা বণিকপুত্রের সততা, সাহস এবং বিদ্যানুরাগের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলেন এবং ঐ জনসমাবেশেই ঘোষণা দিলেন রাজকন্যার সঙ্গে তার বিয়ে হবে। একই সঙ্গে মৃতদার চৌকিদারের সঙ্গে তার প্রেয়সী, তার মেয়ে বিনয়াবতীর সঙ্গে তার প্রেমিক এবং শ্রেষ্ঠিকন্যার সঙ্গে উক্ত বরের বিবাহের ও অনুমতি দিলেন। তারপর শুভ দিনক্ষণ দেখে বণিকপুত্রের সঙ্গে চন্দ্রাবতীর মহাধুমধামে বিবাহ হলো। রাজা তাকে অর্ধেক রাজ্য দিয়ে তার অভিষেক করলেন। বণিকপুত্রও তার পিতা-মাতাকে এনে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।
হিরণ্যক এবার একটু দম নিয়ে পুনরায় বলল: তাই বলছিলাম—যার যা পাবার, সে তা পাবেই। এই হচ্ছে আমার দুঃখের কাহিনী। আমি যখন এমনি বিষাদে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই বন্ধু হিসেবে পেলাম এই লঘুপতনককে। সে নিয়ে এল তোমার কাছে। এখন বাকিটা তোমাদের হাতে।
এবার মন্থরক বলল: ভাই, হিরণ্যক! লঘুপতনক তোমার প্রকৃতই বন্ধু। তা নাহলে তুমি তার খাদ্য হওয়া সত্ত্বেও সে তোমার অনিষ্ট করেনি। পিঠে করে এতদূর নিয়ে এসেছে। আমিও তোমার তেমনই বন্ধু। আমাদের জাত আলাদা হলে কি হবে? তার মধ্য দিয়েও মিলেমিশে থাকা যায়, যদি মনটা ভাল হয় এবং পারস্পরিক বিশ্বাস থাকে। দেখ— বিত্ত হলেও যার চিত্ত-বিকার না জন্মায়, বিপদে যে এগিয়ে আসে, সে-ই হচ্ছে আসল বন্ধু। আর অর্থের জন্য ভেবনা। দেখ, শাস্ত্র বলছে—
খলের প্রীতি মেঘের ছায়া জোয়ার সিদ্ধ-অন্ন।
ধন-যৌবন ভোগ-মাত্র কয়েকদিনের জন্য।।
তাই জিতেন্দ্রিয় পুরুষ কখনো ধনস্পৃহা করেন না। তাছাড়া, ধন উপার্জনে কষ্ট, রক্ষণে কষ্ট, নাশে কষ্ট, ব্যয়ে কষ্ট। আর বুদ্ধি থাকলে তার কাছে ধনার্জন কোনো ব্যাপার নয়। দেশ-বিদেশ বলতেও তার কাছে কিছু নেই। আর একটা কথা। অর্থ কারো চিরদিন থাকে না। আজ এর হাতে তো কাল ওর হাতে। তাই পণ্ডিতরা এর নাম দিয়েছেন ‘চঞ্চলা’। আর অর্থ হচ্ছে ভোগের জন্য। যে তা না করে শুধু উপার্জনই করে, পরিণামে সে কষ্ট পায়, যেমন পেয়েছিল সোমিলক।
হিরণ্যক সাগ্রহে বলল: খুলে বল তো ব্যাপারটা!
মন্থরক: আচ্ছা, শোনো…

