মিত্ৰপ্ৰাপ্তি

মিত্ৰপ্ৰাপ্তি


অদ্যভক্ষ্য ধনুর্গুণ

এক গাঁয়ে থাকত এক ব্যাধ। একদিন সে শিকারে গেল। সেখানে একটা হরিণ শিকার করল। হরিণটাকে কাঁধে নিয়ে ফেরার পথে এক নাদুস-নুদুস শূকর দেখতে পেল। তাড়াতাড়ি হরিণটাকে ফেলে শূকরটাকে তাক করল। তীর খেয়ে শূকরটাও ঘোঁৎ-ঘোৎ করতে করতে ছুটে এল ব্যাধের দিকে। দুজনে ধস্তাধস্তি হলো। এক পর্যায়ে শূকরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এদিকে সাপের লেজে পা পড়তেই দুটি বিষদাঁত বসে গেল ব্যাধের পায়ে। সঙ্গে-সঙ্গে সাপটাকে ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলল। কিন্তু ব্যাধ আর বাঁচল না। কিছুক্ষণ মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করে সেও অক্কা পেল।

এমনি সময় খাবারের সন্ধানে সেখানে এল এক শেয়াল। কদিন ধরে না খাওয়া। পেটের হাঁড়-কখানা গোনা যায়। একসঙ্গে এত খাবার দেখে তার মাথা গেল ঘুরে। সে একবার হরিণটার কাছে যায়। আবার ছুটে আসে শূকরটার কাছে। ব্যাধের নাকটাও শুঁকে দেখে। ফাঁকে সাপের তাজা রক্ত একটু চেটে নেয়। আঃ! এখনও গরম! এরপর যায় ব্যাধের ধনুকের কাছে। ওর গুণটা স্নায়ুর তৈরি। একটু কামড় দিয়ে দেখে। না, খাওয়া চলবে। এবার সে হিসাব করে। শূকরে যাবে একমাস। ব্যাধে যাবে এক পক্ষ। হরিণটায় অর্ধপক্ষ তো যাবেই। সাপে একদিন যাবে। একটু রয়ে-সয়ে খেতে হবে। পণ্ডিতেরা বলেন না— স্বোপার্জিত ধন টনিকের ন্যায় একটু একটু করে ভোগ করতে হয়। তাই আজ ধনুর্গুণ দিয়েই শুরু করি।

এই বলে যেই ধনুকের গুণে কামড় দিয়েছে, অমনি তা ছিঁড়ে যাওয়ায় ধনুকের বাঁশ সোজা হয়ে একেবারে ব্রহ্মতালু ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ছটফট করতে করতে ওখানেই শেয়ালের মৃত্যু হয়।

বৃহৎস্কিক তাম্রচূড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন: তাই বলছিলুম— অতিলোভ করতে নেই। কিছুক্ষণ পরে তাম্রচূড়ের কাছে জানতে চাইলেন: আচ্ছা, ইঁদুরটা থাকে কোথায়? ওর যাতায়াতের রাস্তাটাই বা কি?

তাম্রচূড়: তা তো জানি না। তবে দলবল নিয়ে আসে, আবার দলবল নিয়ে চলে যায়।

বৃহৎস্ফিক: হুঁ। যাক গে। তা তোমার কি শাবল-টাবল কিছু আছে?

তাম্রচূড়: আছে। ঐ তো, আগা-গোড়া লোহার।

বৃহৎস্কিক: বেশ। ওটা কাজে লাগবে। কাল কাকভোরে উঠে লোকজনের চলাফেরায় মাটির দাগ মুছে যাওয়ার আগেই আমরা ওদের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে পৌঁছে যাব ওর ডেরায়। তারপর ওর সব কেরামতি শেষ।

এসব বলতে বলতে হিরণ্যকের গলাটা একটু ধরে এল। দম নিয়ে লঘুপতনকের দিকে তাকিয়ে সে বলতে শুরু করল: বিশ্বাস কর, বন্ধু! ও বেটার কথা শুনে আমার পিলে গেল চমকে! ভাবলুম, আর বুঝি রক্ষে নেই। বুদ্ধির জোরে এ যখন টাকার খবরটাই জেনে গেছে, তখন আমার দুর্গও সে খুঁজে বের করবে! ওর কথা শুনেই আমি বুঝতে পেরেছি! মানুষ চিনতে আমার ভুল হয়না! দক্ষ ব্যক্তি হাতে ধরেই বস্তুর ওজন নিতে পারে!

একটু দম নিয়ে হিরণ্যক আবার শুরু করল: আমিও কম নই। দল চালাতে হলে নানা রকম বুদ্ধি রাখতে হয়। আমি দুর্গের পথ ছেড়ে অন্যপথে দল নিয়ে ছুটতে লাগলাম। কিন্তু বিধি বাম! ব্যাধের জাল ছিঁড়ে তীর এড়িয়ে হরিণ বাঘের মুখে পড়লে যে অবস্থা হয়, আমাদেরও যেন সেই অবস্থা হলো। হঠাৎ সামনে পড়ল এক প্রকাণ্ড বেড়াল। মুহূর্তে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল আমাদের উপর। অনেককে মারল, অনেককে আহত করল। বাকিরা আমায় ভুল বুঝল। ইচ্ছে করেই আমি তাদের ভুলপথে এনেছি এই অভিযোগ দিয়ে রক্তমাখা পায়ে তারা দুর্গের পথে ছুটল। আমার কথা শুনল না। ফলে যা হবার তা-ই হলো। ঐ দুষ্ট পরিব্রাজক ফোঁটা-ফোঁটা রক্তমাখা পায়ের দাগ অনুসরণ করে ঠিক দুর্গে গিয়ে পৌঁছে গেল। তারপর শাবল দিয়ে খুঁড়ে টাকার ভাণ্ডটা নিয়ে দুজনে মন্দিরে চলে গেল। এতদিন যার গরমে আমি অসাধ্য সাধন করতাম, আমার সে শক্তি শেষ হয়ে গেল। কিছুদিন পরে দুর্গে ফিরে গেলাম। সেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে আর ভাল লাগল না। কয়েকদিন কষ্টে-শিষ্টে কাটালাম। তারপর এক রাতে দলবল নিয়ে গেলাম মন্দিরে। বুক ধড়ফড় করছে! গিয়ে দেখি দুজনে বসে গল্প করছে। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েই তাম্রচূড় ভিক্ষাপাত্রটা পেটাতে শুরু করলেন। বৃহৎস্ফিক বললেন: কি হলো?

তাম্রচূড়: ঐ পাজিটা আবার এসেছে।

বৃহৎস্ফিক হেসে বললেন: বন্ধু, ও আর লাফাবে না। ওর কেরামতি শেষ। যার জোরে লাফাত, তাতো এখন তোমার বালিশের নিচে।

হিরণ্যক: ওদের ঐ মস্করা শুনে আমার পিত্তি গেল জ্বলে! আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারলাম না। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে দিলাম লাফ। কিন্তু, না! পারলাম না! ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলাম। তা দেখে ওরা হো-হো করে হাসতে লাগল। আমার বড় শত্রুটা তাম্রচূড়কে বললেন: দেখলে তো মজাটা! ওর লম্ফ-ঝম্প সব শেষ! বলেছি না—টাকাই সব। টাকা থাকলেই শক্তিমান, টাকা থাকলেই পণ্ডিত। টাকা নেই তো সব সমান। ইঁদুরটাও তাই এখন অন্যদের সমান হয়ে গেছে। এবার তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও। কথায় বলে না—

দাঁতহীন সাপ আর মদহীন হাতি।
অর্থহীন পুরুষ খায় সকলের লাথি॥

বৃহৎস্ফিকের কথা শুনে আমারও তখন মনে হতে লাগল, সত্যিই তো! অর্থহীন পুরুষের জীবনের দাম কি? গরমকালে ছোট নদী যেমন শুকিয়ে যায়, অর্থহীন পুরুষের সকল গুণও তেমনি নষ্ট হয়ে যায়। দরিদ্রের গুণ থাকলেও তা প্রকাশ পায় না। সূর্য যেমন জগৎকে প্রকাশ করে, অর্থও তেমনি মানুষের সকল গুণ প্রকাশ করে। যে গরিব হয়েই জন্মায়, তার তেমন কষ্ট থাকে না। কিন্তু একবার যার প্রচুর ধন ছিল, দারিদ্র্য তার কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক। সমাজে দরিদ্রের কোনো স্থান নেই। সবাই তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। সে কারো উপকার করতে গেলেও কেউ আমল দেয় না। উঠে চলে যায়। ভাবে, কিছু চাইতে এসেছে। দরিদ্রের কোনো বন্ধু থাকে না। বন্ধুও শত্রু হয়ে যায়। আত্মীয়রা পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। বিধবার স্তনযুগলের মতো গরিবের বুকে কত স্বপ্নই জাগে! কিন্তু তা বুকেই মিলিয়ে যায়। দারিদ্র্যের অন্ধকারে যে আচ্ছন্ন, পরিপূর্ণ দিবালোকেও কেউ তাকে দেখতে পায় না। এসব ভাবতে ভাবতে দেখলাম, তাম্রচূড় টাকার থলেরাখা বালিশটায় গালটা লাগিয়ে শুয়ে পড়ল। কয়েকদিন আগেও আমি যার উপর বসে থাকতাম। তারপর এক সময় শূন্য দুর্গে ফিরে এলাম। কিন্তু তখনও বুঝতে পারিনি যে, শেষ আঘাতটা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।

একথা বলতে বলতে হিরণ্যকের কণ্ঠ আবার রুদ্ধ হয়ে এল। কাক আর কচ্ছপের হৃদয় করুণায় গলে যাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে হিরণ্যক আবার বলল: আমি দুর্গের কাছে যেতেই দেখি আমার ভৃত্যরা সব চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ বলাবলি করছে—যার ভরণ-পোষণ দেয়ার মুরোদ নেই, তার সঙ্গে থেকে লাভ কি? তাতে শুধু বিপদই বাড়ে। আমি তখন একেবারেই একা। এতদিন যাদের আহার যুগিয়েছি, তারা কেউ আর পাশে রইল না! ভাবলাম—ধিক্ এই দারিদ্র্যকে। এ জীবন দিয়ে কি হবে? কথায় বলে না—যে শ্রাদ্ধে বৈদিক ব্রাহ্মণ আসে না, সে শ্রাদ্ধ মৃত। যে মিলনে সন্তান হয় না, সে মিলন মৃত। যে যজ্ঞে দক্ষিণা নেই, সে যজ্ঞ মৃত। আর যার ধন-দৌলত নেই, সে জীবত। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে হিরণ্যক বলতে লাগল: কষ্টের এখানেই শেষ নয়! দেখি, আমার চোখের সামনে দিয়ে আমার ভৃত্যরা আমার শত্রুর সেবক হয়ে গেল। শুধু তা-ই নয়, আমার দিকে মুচকি মুচকি হেসে আমাকেই টিটকারি মারতে লাগল। আমি আর সইতে পারলাম না। দুর্গে ঢুকে কপাট মেরে পড়ে রইলাম। এভাবে অনাহারে অনিদ্রায় কয়েকদিন কাটল। তারপর একদিন ভাবলাম: আমার ধন চুরি করে অন্যে ধনী হবে, সম্মান পাবে, আর আমি অপমানিত হব এ হয় না। চুরি যাওয়া ধন উদ্ধারে যদি আমার প্রাণও যায় তা-ও ভাল। শাস্ত্রে আছে—চুরি যাওয়া ধন উদ্ধার না করে যে নিজের প্রাণটি রক্ষা করে, তার দেয়া জলাঞ্জলি পিতৃপুরুষও গ্রহণ করেন না। তাছাড়া, যে গোরক্ষায়, ব্রাহ্মণ রক্ষায়, স্ত্রীরক্ষায়, বিত্তরক্ষায় কিংবা যুদ্ধে প্রাণ দেয়, সে শাশ্বত স্বর্গ লাভ করে। তাই সিদ্ধান্ত নিলুম—যা আছে কপালে, আমার ধন আমার চাই-ই। ও বেটা ঘুমুলে চুপি-চুপি বালিশ কেটে টাকার থলেটা নিয়ে ভাগব। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একদিন রাতে গিয়ে কুট-কুট করে বালিশ কাটছি। অমনি বেটা জেগে উঠল। ফাটাবাশ দিয়ে মারল এক বাড়ি। মাথাটা আমার ফেটে গেল। নেহাৎ আয়ুর জোরে বেঁচে গেলাম। কোনরকমে দুর্গে ফিরে ভাবলাম, পণ্ডিতেরা ঠিকই বলেছেন—

যার যা পাবার পাবেই সে তা।
কাহার সাধ্য ঠেকাইবে তা।।
গ্রন্থ কিনে বণিকপুত্র।
ঘরছাড়া হয় বলামাত্ৰ।।
ভাগ্যগুণে, শোনো কথা—
হয়ে গেলো রাজ-জামাতা॥

কাক ও কচ্ছপ পরম উৎসাহে বলল: তার মানে?

হিরণ্যক: শোনো তাহলে…


Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *