ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী
এক গাঁয়ে থাকতেন এক ব্রাহ্মণ দম্পতি। কোনরকমে দিন কাটছিল। বর্ষাকালের এক সকাল। ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণীকে বললেন: আজ দক্ষিণায়ন সংক্রান্তি। খুব প্রশস্ত দিন। এই দিনে দান-ধ্যান করলে অনন্ত পুণ্য হয়। তাই আমি দান নিতে ভিন গাঁয়ে যাচ্ছি। তুমি ভগবান সূর্যের নামে একজন ব্রাহ্মণকে ডেকে কিছু খাইয়ে দিও।
সঙ্গে-সঙ্গে ক্রুদ্ধ ফণিনীর ন্যায় ফোঁস-ফোঁস করে ব্রাহ্মণী বলে উঠলেন: টাকা নেই, পয়সা নেই, ব্রাহ্মণ খাওয়াব! বলতে লজ্জা লাগে না? তোমার হাতে পড়ে আমার জীবনটাই মাটি হয়ে গেল! না পেলুম একটু সুখ! না পেলুম একটু মিষ্টি-মাষ্টা চাটতে! গয়না পরার বায়না? সে আর বলতে মন চায়না!
ব্রাহ্মণ মনে একটু কষ্ট পেলেও ধীরে-ধীরে বললেন: এরকম বলতে নেই, গিন্নি। দেখ ঘরভর্তি টাকা না থাকলেই কি এক মুষ্টি অন্ন কাউকে দেয়া যায় না? শাস্ত্র বলছে না—বড়লোকেরা কাড়িকাড়ি দান করে যে ফল পায়, গরিবকে এক কড়ি দিলেই সে-ফল পাওয়া যায়। তাইতো, কৃপণ যতই ধনী হোক তার কাছে কেউ যায় না, যায় দাতার কাছেই। তাছাড়া দেখ—
মিঠেজলের কুয়ো সে যতই ছোট হোক
তার কাছেই ছুটে যায় গাঁয়ের সর্বলোক।
সমুদ্র সে অনন্ত যার নাহি সীমারেখা
তৃষ্ণা পেলে তার কাছে পাও কারো দেখা??
আরো দেখ— কুবেরের অঢেল সম্পদ। কোনো দান-ধ্যান করেনি। আজীবন আগলে রেখেছে। কিন্তু, কেউ কি তার কথা বলে? অথচ শিব? নির্ধন। তবুও তাঁকেই সবাই মহেশ্বর বলে। কাজেই দান করতে বেশি ধন লাগেনা। তোমার যা আছে, তা দিয়েই অতিথিসেবা কর।
ব্রাহ্মণের কথায় ব্রাহ্মণী শান্ত হলেন। মনে মনে ভাবলেন—ঘরে কিছু তিল আছে। তা দিয়েই ব্রাহ্মণসেবা করবেন।
ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণ গাঁয়ে চলে গেছেন। ব্রাহ্মণী ঐরূপ চিন্তা করতে করতে ঘরে ঢুকলেন। পাত্র থেকে তিলগুলো বের করে খোসা ছাড়িয়ে রোদে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দেখেন—একটি কুকুর তাতে মূত্রপাত করছে। বৈশাখী রোদের মতো ব্রাহ্মণীর মেজাজ গেল চড়ে। তিনি খিস্তি মেরে বললেন: হায়রে কুত্তার পো! মরার আর জায়গা পেলি না!
ব্রাহ্মণী রান্নাঘরের দাওয়ায় ধপাস করে বসে পড়লেন। রাগে-দুঃখে কিছুক্ষণ তিনি কথাই বলতে পারলেন না। হঠাৎ মাথায় এক দুষ্টবুদ্ধি এল। তিনি ভাবলেন: পাশের বাড়ি গিয়ে কোটা তিলের পরিবর্তে যদি গোটা তিল আনি, তাহলে আমার তিনগুণ লাভ। মূত্রদুষ্ট তিল এমনিতেই ফেলে দিতে হতো, কারণ এতে ব্রাহ্মণসেবা হবেনা। আর কোটা তিলের পরিবর্তে গোটা তিল পাব বেশি। অর্ধেক রেখে দেব। বাকি অর্ধেকে ব্রাহ্মণসেবা হবে।
এরূপ চিন্তা করে ব্রাহ্মণী তিলগুলো ধুয়ে-মুছে পাশের বাড়ি নিয়ে গেলেন। হাঁক দিয়ে বললেন: কই গো দিদি, গোটা তিল দিয়ে কোটা তিল নেবে? তাহলে এস।
গিন্নিমা ভাবলেন গোটা তিল দিয়ে যদি কোটা তিল পাওয়া যায় তাহলে মন্দ কি? তিনি উত্তর দিলেন: একটু বস, বামুনদিদি। আমি আসছি।
এদিকে গিন্নিমা’র কামন্দকী শাস্ত্রপড়া পুত্র ভাবল: কোটা তিল দিয়ে গোটা তিল নিচ্ছে, এর কারণ কি? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো রহস্য আছে। সে মাকে সাবধান করে বলল: মা, কোটা তিল দিয়ে কেউ গোটা তিল নেয় না। নিলে, শাস্ত্রমতে এক্ষেত্রে রহস্যদোষ আছে। তুমি হাত বাড়িও না। আমি দেখছি।
এই বলে ব্রাহ্মণীর দিকে এগোতে থাকলে তিনি সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু, ধরা পড়ে সব স্বীকার করলে বিচারে তাঁদের গ্রামছাড়া করা হয়। আসলে, অতিলোভীর এভাবেই মরণ হয়, যেমন হয়েছিল লোভী শেয়ালের।
তাম্রচূড়: সে আবার কি?
বৃহৎস্ফিক: শুনবে? শোনো তাহলে …

