মিত্ৰপ্ৰাপ্তি

মিত্ৰপ্ৰাপ্তি


হিরণ্যকের আত্মকথা

পরদিন সকালে লঘুপতনক, মন্থরক ও হিরণ্যক একত্র মিলিত হয়েছে। মন্থরক হিরণ্যককে বলল: তা তোমার কাহিনী বলো, ভাই, শুনি।

লঘুপতনক সাগ্রহে বলল: হ্যাঁ বন্ধু, এতদিনতো আমাকেও বলোনি। আজ বলো, আমরা শুনি।

হিরণ্যক বলতে লাগল: দাক্ষিণাত্যে মহিলারোপ্য নামে এক নগর ছিল। তার অদূরেই ছিল এক শিবমন্দির। সেখানে থাকতেন তাম্রচূড় নামে এক পরিব্রাজক। নগরে ভিক্ষে করে তাঁর জীবন কাটত। খেয়েদেয়ে যা অবশেষ থাকত, তা তিনি নাগদন্তে ঝুলিয়ে রাখতেন। পরের দিন ভোরে চাকর-বাকরদের সেই খাবার দিতেন। বিনিময়ে তারা মন্দির ধুয়ে-মুছে দিত।

একদিন আমার লোকেরা এসে বলল: কত্তা, আমরা যে না খেয়ে মারা যাচ্ছি গো! একটা কিছু করুন!

জানতে চাইলে তারা বলল: মন্দিরের খাবারগুলো বেটা এত উঁচুতে ঝোলায় যে, আমাদের নাগালের বাইরে। কিছুতেই ওখানে পৌঁছুতে পারি না। কিন্তু, কত্তা যেতে পারেন না এমন জায়গা নেই। তাই একটা ব্যবস্থা করুন।

এ-কথা শোনার পর আমি তাদের নিয়ে সেখানে গেলাম। এক লাফে নাগদন্তে উঠে একে একে সবাইকে উঠালাম। তারপর খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চলে এলাম। এভাবে দিন চলতে লাগল। আমাদের তাড়ানোর জন্য তাম্রচূড় এক সময় পাহারা দিতে শুরু করেন। কিন্তু পাহারা দিতে দিতে যখন ঘুমে ঢলে পড়তেন, সেই ফাঁকে আমরা সব সাবার করে আসতাম।

কিন্তু একদিন বিপত্তি ঘটল। তাম্রচূড় একটা ফাটাবাঁশ এনে শুয়ে শুয়ে ঐ ঝুলন্ত ভিক্ষাপাত্রটা পেটাতে লাগলেন। ভয়ে আমরা আর কাছেই যেতে পারলাম না। এভাবে দিন যেতে লাগল। একদিন মন্দিরে এলেন তাম্রচূড়ের বন্ধু বৃহৎস্কিক। তিনিও পরিব্রাজক। ধার্মিক। তীর্থভ্রমণে বের হয়ে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।

বন্ধুকে পেয়ে তাম্রচূড়তো মহাখুশি। সসম্মানে দাঁড়িয়ে অতিথিকে গ্রহণ করলেন। রাতের বেলা কুশাসনে শুয়ে দু-বন্ধু আলাপচারিতায় মগ্ন। বৃহৎস্কিক কতরকম গল্প করছেন। ধর্মের কথা। পাপ-পুণ্যের কথা। আরো কত কি। কিন্তু তাম্রচূড় কেবল ফাটাবাশ দিয়ে ভিক্ষাপাত্র পেটাচ্ছেন, আর মাঝে-মধ্যে হুঁ-হাঁ করছেন। কোনো কথা বলছেন না। তাঁর মন সম্পূর্ণ ঐদিকে।

খানিক পরে অতিথি চটে লাল! তিনি তাম্রচূড়কে বললেন: আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি আসল বন্ধু নও। আমি আসায় তুমি খুশি হওনি। দেখ, প্রকৃত বন্ধু বন্ধুকে পেলে সাগ্রহে বলে— আরে! এস এস। বস। বিশ্রাম নাও। কদ্দিন পরে এলে। খবর কি? কেমন আছ? বড় রোগা হয়ে গেছ। বেশ কিছুদিন থাকবে এবার। ইত্যাদি। কিন্তু বাড়িতে অতিথি এলে গৃহস্থ যদি কেবল উপরে আর নিচের দিকে তাকায়, কিংবা মিষ্টিমুখে পাঁচটি কথা না বলে, তাহলে তার বাড়িতে মূর্খ ছাড়া আর কে যায়? আর তোমার এত গর্বই বা কিসের? সবেধন তো এই মঠটি। তাতেই এত গর্ব! জাননা, পণ্ডিতেরা বলেছেন—নরকে যেতে চাওতো বছরখানেক যজমানি কর, কিংবা দিনতিনেক মোহন্তগিরি। তুমিও দেখছি সেই পথেই এগুচ্ছ। কাজেই আমি চললুম। এই রাতেই। তোমার এখানে আর নয়।

এই বলে বৃহৎস্ফিক উঠে দাঁড়ালেন। তাম্রচূড় তাঁর হাত ধরে মিনতি করে বললেন: বন্ধু, আমায় ভুল বুঝনা। একটা ভয়ানক ইঁদুর বড্ড জ্বালাচ্ছে। ও দলবল নিয়ে এসে শিকেয় তোলা ঐ ভিক্ষান্ন সব খেয়ে যায়। পরের দিন চাকর-বাকরদের কিছু দিতে পারি না। তাই মন্দির ধোয়া-মোছার কাজও বন্ধ। ওকে তাড়ানোর জন্যই এ ব্যবস্থা। অন্য কিছু নয়।

ঘটনা শুনে বৃহৎস্কিক শান্ত হলেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন: ইঁদুরটা কোথায় থাকে?

তাম্রচূড়: ঠিক জানি না।

একটু চিন্তা করে বৃহৎস্কিক বললেন: নিশ্চয়ই ওর গর্তটা কোনো গুপ্তধনের উপর। কারণ, টাকার গরম ছাড়া এত লম্ফ-ঝম্প করা যায় না। কথায় বলেনা—

ট্যাকে যদি থাকে টাকা, তাতেই বাড়ে জোর।
দান-ধ্যান করলে আর, কথা কি-বা ওরা।।

তবে দানের উদ্দেশ্য অসৎ হলে ধরা পড়তে হয়, যেমন পড়েছিল ব্রাহ্মণী।

তাম্রচূড় উৎসাহের সঙ্গে বলল: সে কেমন?

বৃহৎস্ফিক: শোনো তাহলে …


Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *