ব্রাহ্মণ ও বণিক
এক নগরে থাকত এক ব্রাহ্মণ। সে ছিল খুব বিদ্বান, কিন্তু লোভী। একবার ঐ নগরে এল তিন ভিনদেশী বণিক। তারা সওদা বিক্রি করে প্রচুর অর্থোপার্জন করল। তা দেখে ব্রাহ্মণের ভীষণ লোভ হলো। কি করে অর্থ হাতানো যায়, ভাবতে লাগল।
এদিকে বণিকরা ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। তা দেখে ব্রাহ্মণ অস্থির হয়ে উঠল। ওঃ! এত টাকা! আর সে কিছুই পাবে না! এটা কি করে হয়? তাই অনেক ভেবে-চিন্তে স্থির করল—বণিকদের সঙ্গে যাবে। পথে বিষ দিয়ে হত্যা করে টাকা-পয়সা নিয়ে ভাগবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী বণিকদের কাছে গিয়ে বিগলিত কণ্ঠে বলল: বন্ধুরা! তোমাদের স্নেহপাশে আমি আবদ্ধ হয়ে পড়েছি! তোমাদের ছাড়া আমি বাঁচব না! দয়া করে আমাকে তোমাদের সঙ্গে নাও!
তার করুণ বিলাপে বণিকদের মন গলে গেল। তাই সেও তাদের সঙ্গে চলল।
পথে চারজন এক গভীর বন দিয়ে যাচ্ছে। জায়গাটি কিরাতদের দখলে। কিরাতরা কাকচরিত্র জানে। তাদের ভাষা বোঝে। বণিকদের দেখে কাকগুলো বলতে লাগল—
কিরাত, কিরাত, দৌড়ে আয়।
টাকা নিয়ে বণিক যায়।
কাকদের কথা শুনে কিরাতরা দৌড়ে এল। চারজনকে বেঁধে ফেলল। লাঠিপেটা করে সকলের কাপড় খুলে ফেলল। কিন্তু কিছুই পেল না। কারণ বণিকরা টাকা রেখেছিল পায়ের নীচে জুতার মধ্যে। একথা ব্রাহ্মণও বুঝতে পারেনি। তখন ক্রুদ্ধ হয়ে কিরাতরা বলল: দেখো, তোমাদের কাছে নিশ্চয় টাকা আছে। কাকদের কথা মিথ্যে হয়না। তাই, ভালোয় ভালোয় দিয়ে দাও। নইলে সবকটাকে মেরে চামড়া খুলে টাকা নেব।
সবাই নীরব। তখন কিরাতরা ঐ ব্রাহ্মণকেই আগে মারল। তার চামড়া খুলে দেখল কিছুই নেই। তখন বাকিদের ছেড়ে দিল। তাই বলছিলুম—বেশি লোভ করা ভালো নয়।
দমনক আর করটকের এরূপ বাক্যালাপের এক পর্যায়ে পিঙ্গলকের প্রচণ্ড থাবায় সঞ্জীবক মারা গেল। তার বিশাল দেহ সশব্দে মাটিতে পড়ে গেল। তার নিথর দেহের প্রতি তাকিয়ে পিঙ্গলক করুণ কণ্ঠে বলতে লাগল: আমি কি পাপিষ্ঠ! সঞ্জীবক আমাকে কত বিশ্বাস করত! অথচ আমি তাকে মেরে ফেললাম! এমন বিশ্বাসঘাতকতার চেয়ে বড়ো পাপ আর কি হতে পারে! শাস্ত্র ঠিকই বলেছে: যারা বন্ধুর ক্ষতি করে, যারা অন্যের উপকার ভুলে যায়, আর যারা বিশ্বাসঘাতক—তারা সবাই নরকে যায়। লোকে বলে: রাজার রাজ্য যাওয়া, আর বিশ্বস্ত বন্ধু মরা একই কথা। কিন্তু, আমি বলি—এ দুটি এক নয়। রাজ্য গেলে রাজ্য পাওয়া যায়, কিন্তু বিশ্বস্ত বন্ধু পাওয়া যায়না।
পিঙ্গলক সঞ্জীবকের জন্য এভাবে বিলাপ করতে থাকলে দমনক এগিয়ে এসে সোল্লাসে বলল: প্রভু, একটা তৃণভোজীর জন্য এভাবে বিলাপ করা রাজার শোভা পায়না। শাস্ত্রে আছে না—
পিতা কিংবা পুত্র কিংবা বন্ধু-ভাৰ্যা-ভাই।
শত্রু হলে তাকে বধে দোষের কিছু নাই।।
আরো দেখুন—দয়ালু রাজা, স্বাধীন স্ত্রী, অবাধ্য ভৃত্য, দায়িত্বহীন সচিব, দুষ্ট সহায়ক, সর্বভুক ব্রাহ্মণ এবং অকৃতজ্ঞ―এ ক’জন সর্বদা পরিত্যাজ্য। বুদ্ধিমান এবং উন্নতিকামী ব্যক্তিরা কখনো এদের ঠাঁই দেয়না।
তাছাড়া, রাজনীতির ধর্মই হলো—কখনো সে সত্য বলে, কখনো মিথ্যা বলে; কখনো রূঢ়কথা বলে, কখনো প্রিয়কথা বলে; কখনো সে নৃশংস, কখনো দয়ালু; কখনো প্রচুর খরচ করে, কখনো অজস্র অর্জন করে; আসলে রাজনীতি হচ্ছে পতিতার ন্যায় বহুরূপিণী।
দমনক এভাবে বোঝালে পিঙ্গলকের মন থেকে সঞ্জীবকের মৃত্যুজনিত শোক কেটে যায়। সে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে এবং দমনককে প্রধানমন্ত্রীর পদ ফিরিয়ে দেয়। ঐদিন সঞ্জীবকের টাটকা মাংসে সবার ভুরিভোজ হয় এবং তারপর থেকে দমনকের বুদ্ধিতে পিঙ্গলক সুখে রাজত্ব করতে থাকে।

